নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে শুরু করে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছেন। বিশেষ করে সাংগঠনিক জনপ্রিয়তা নিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকারে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
নীতিনির্ধারক পর্যায়ের স্পষ্ট ঘোষণা- অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, ত্যাগী এবং পরিচ্ছন্ন ইমেজসম্পন্ন ব্যক্তিরাই কেবল বিএনপির সমর্থন পাবেন।
সরকার গঠনের পর এবার উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে তরুণদের সুযোগ করে দিতে চায় বিএনপি। তবে বিএনপি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ত্যাগীদেরও যথাযথ মূল্যায়ন করবে বলে আশ্বস্ত করছে।
দলীয় কোন্দল ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে বিজয় নিশ্চিতই লক্ষ্য
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়কে ভিত্তি ধরা হচ্ছে। প্রথমত, স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা কেমন, দ্বিতীয়ত, বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে এবং দলের দুর্দিনে ওই নেতার ভূমিকা ও অবদান কী ছিল এবং তৃতীয়ত, এলাকার মানুষের কাছে তার কোনো ধরনের নেতিবাচক বা বিতর্কিত পরিচিতি আছে কি না। দলীয় কোন্দল এড়িয়ে এবং স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিজয় নিশ্চিত করতে সক্ষম এমন প্রার্থীদেরই মাঠে নামানোর পরিকল্পনা করছে দলটি।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা জোরপূর্বক কাউকে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই
প্রার্থী বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়া এবং দলের সামগ্রিক রণকৌশল সম্পর্কে কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি এককভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চাওয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
দলের দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন সর্বদা জনপদের মানুষের সরাসরি ভোটের লড়াই। এখানে রাষ্ট্রীয় বা দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে কিংবা জোরপূর্বক কাউকে চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিএনপি সব সময় জনগণের শক্তিতে বিশ্বাস করে। তাই আমাদের প্রার্থী তালিকার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো- তাকে অবশ্যই জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা পরীক্ষিত ও জনপ্রিয় মুখ হতে হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে অতীতে যার বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, বিএনপি তাকে কোনোভাবেই সমর্থন দেবে না।’ কারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন আর কারা পারবেন না, সে বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা পাঠানো হয়েছে তৃণমূলে।
এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শুধু দলীয় পদ-পদবি থাকলেই কাউকে প্রার্থী করা হবে না। মাঠের জরিপ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি ইউনিয়নে, পৌরসভায় এবং সিটিতে আলাদা প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে একদম স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করবে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের মনোনয়ন বোর্ড।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত আইনগত যোগ্যতা এবং দলীয় এই কঠোর মানদণ্ডে বা বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এক নতুন ধারার প্রতিযোগিতার সূচনা হতে যাচ্ছে। একদিকে যেমন ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিক বা লাভজনক পদে থাকা ব্যক্তিরা আইনগতভাবে নির্বাচন করতে পারবেন না, তেমনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কড়া নীতির কারণে বিতর্কিতরা দলীয় সমর্থন থেকে ছিটকে পড়বেন। সব মিলিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বিএনপির এই কঠোর ও কৌশলগত অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
দলের প্রভাবশালী স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ত্রকজন এ প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, বিগত বছরগুলোতে যারা দলের চরম দুঃসময়ে রাজপথে থেকে আন্দোলন টিকিয়ে রেখেছেন এবং জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েও আদর্শচ্যুত হননি, তাদের মূল্যায়ন করাই হবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য।
তিনি আরো বলেন, আমাদের বিএনপির হাইকমান্ড প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, প্রার্থী নির্বাচনে কোনো স্বজনপ্রীতি বা লবিং চলবে না। যিনি এলাকায় সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং জনকল্যাণমুখী কাজের সঙ্গে যুক্ত, তিনিই মনোনয়ন পাবেন। যারা গত দেড় দশকে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ধরনের দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি বা জনবিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা নিশ্চিতভাবেই দলের সমর্থন থেকে বঞ্চিত হবেন। এমনকি দলে থেকে যারা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন বা দলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিগত ফায়দা লুটেছেন তাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন