চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে ডেনমার্কের সহযোগিতায় নির্মিতব্য লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের (LCT) গ্রাউন্ড ব্রেকিং (ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন) অনুষ্ঠিত হয়েছে।
৩০ আগস্ট ২০২৬ রোববার সকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া প্রজেক্ট সাইটে এ গ্রাউন্ড ব্রেকিং অনুষ্ঠিত হয়।
এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা সম্প্রসারণে একটি নতুন অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, এমপি।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “আজকের দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বন্দর উন্নয়নে আমরা একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আধুনিক টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার সর্বাধুনিক যুগে প্রবেশের পথে বাংলাদেশ আজ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।”
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯৩ শতাংশ এ বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক বাণিজ্যের চাহিদা পূরণে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
নৌপরিবহন মন্ত্রী আরও বলেন, “আমাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সেই বাণিজ্যকে আরও দ্রুত, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার জন্য আধুনিক বন্দর অবকাঠামো অপরিহার্য। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল সেই প্রয়োজন পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”
তিনি বলেন, PPP (Public-Private Partnership) মডেলে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে। ডেনমার্কভিত্তিক APM Terminals-এর মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালিত হবে। এ বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং দেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
মন্ত্রী বলেন, “সম্পূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগে এ ধরনের একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে চায়, বিনিয়োগ করতে চায়। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশের যে আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন, আজকের এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তা আরও সুদৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথা তুলে ধরে নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, এখানে আধুনিক কনটেইনার ইয়ার্ড, জেটি, গেট, কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। সর্বাধুনিক Ship-to-Shore (STS) ক্রেন এবং বৈদ্যুতিক Rubber Tyred Gantry (RTG) ক্রেনসহ আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, “এখানে আধুনিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা থাকবে, থাকবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা। এর ফলে আমাদের পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
মন্ত্রী আরও বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে প্রায় ৮ লাখ TEUs। প্রায় ৬১৬ মিটার দীর্ঘ continuous jetty নির্মাণের মাধ্যমে একই সঙ্গে বড় আকারের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বন্দর ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, “গ্রিন পোর্ট প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার আমাদের রয়েছে, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে আমরা একটি আধুনিক ও টেকসই টার্মিনাল প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি।”
চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে শেখ রবিউল আলম বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক করার যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, তা লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যেই শেষ হবে না। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। চট্টগ্রাম বন্দরের আরও কয়েকটি টার্মিনাল ও অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও অভিজ্ঞ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে। দেশের স্বার্থ, অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এসব বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি জানান, সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতি, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। দেশের স্বার্থে যেখানে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগ কাজে লাগানো সম্ভব, সেখানে সরকার তা কাজে লাগাতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে আরও প্রসারিত করার জন্য দেশের স্বার্থে যেখানে যে আন্তর্জাতিক দক্ষতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কাজে লাগানো সম্ভব, আমরা তা কাজে লাগাতে চাই। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে এবং লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।”
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নের এ অগ্রযাত্রায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রকল্পের বিস্তারিত:
চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষিণ প্রান্তে কর্ণফুলী নদীর তীরে পতেঙ্গার লালদিয়া চরে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। PPP মডেলে বাস্তবায়িত প্রকল্পটিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং পুরো বিনিয়োগই বিদেশি। ডেনমার্কভিত্তিক APM Terminals-এর মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালিত হবে।
প্রকল্পের আওতায় আধুনিক কনটেইনার ইয়ার্ড, জেটি, গেট, কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। টার্মিনালের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে প্রায় ৮ লাখ TEUs। জেটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৬১৬ মিটার (continuous)। এখানে সর্বাধুনিক Ship-to-Shore (STS) ক্রেন এবং বৈদ্যুতিক Rubber Tyred Gantry (RTG) ক্রেনসহ আধুনিক কার্গো হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কর্ণফুলী টানেল এবং মেরিন ড্রাইভ সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় দেশের প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে এর যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সুবিধাজনক হবে। ফলে কনটেইনার পরিবহন, পণ্য খালাস ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে বড় জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে বাংলাদেশের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। দেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানি এবং রপ্তানি পণ্য পরিবহন আরও সহজ ও দ্রুত হবে। এর ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সময় ও লজিস্টিকস ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কর্ণফুলী নদীর সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের সঙ্গে সমুদ্রবন্দরভিত্তিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার সমন্বয় আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে আধুনিক ও দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশের লজিস্টিকস সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
এ টার্মিনাল শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিই করবে না; বরং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং লজিস্টিকস হাব হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে একটি সম্ভাবনাময় নতুন অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাবৃন্দ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন