সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিমান চলাচলে বিঘ্নের প্রভাবে আকাশপথে যাতায়াতের ব্যয় বেড়েছে। দেশটি থেকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে আগ্রহী ধনী যাত্রী ও করপোরেট নির্বাহীদের চাহিদা বাড়ায় ব্যক্তিগত বিমানের ভাড়া ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকাররা।
বিমানবন্দর বন্ধ, বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল এবং বিকল্প বিমানবন্দরের ওপর নির্ভরতা—সব মিলিয়ে সৌদি আরবে বিমান চলাচল ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। এই পরিস্থিতিতে যাঁদের ব্যক্তিগত বিমানে যাত্রার সামর্থ্য রয়েছে, তাঁরা তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত বিমানের ব্যয় বহন করতে না পারা কিছু যাত্রী বাণিজ্যিক ফ্লাইট ধরতে প্রতিবেশী বাহরাইন ও কাতারে যাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে ব্যক্তিগত বিমানের ভাড়া
ব্যক্তিগত বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান লাক্স জেটসের আলেকজান্ডার গ্রাহামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে সৌদি আরবের রিয়াদের উত্তরে আল-কাসিম বিমানবন্দর থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাগামী একটি বোম্বার্ডিয়ার গ্লোবাল ৬০০০ বিমানের ভাড়া ছিল ৯৪ হাজার ইউরো।
দীর্ঘপাল্লার এই বিমানে ১৪ জন যাত্রীর বসার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর বন্ধ হওয়ার আগে একই যাত্রার ভাড়া ছিল প্রায় ৬০ হাজার ইউরো।
অর্থাৎ, একই রুটে বিমানের ভাড়া বেড়েছে ৩৪ হাজার ইউরো—প্রায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে ব্যক্তিগত বিমানের সীমিত প্রাপ্যতা এবং বাড়তি চাহিদা যে ভাড়ার ওপর চাপ তৈরি করেছে, এই হিসাব তার একটি উদাহরণ।
গ্রাহাম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, বিমানের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় ভাড়া বাড়ছে। ফলে যাঁরা এই সেবা নিতে আগ্রহী, তাঁদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
কেন বিকল্প বিমানবন্দরের দিকে ছুটছেন যাত্রীরা?
রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে। এ অবস্থায় রাজধানী থেকে ২০০ মাইলেরও বেশি দূরে অবস্থিত আল-কাসিম বিমানবন্দর ব্যক্তিগত বিমানযাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠেছে।
ব্যক্তিগত বিমান পরিচালনাকারী চারজন নির্বাহীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ছাড়তে আগ্রহী যাত্রীদের কেউ কেউ আল-কাসিম থেকে ব্যক্তিগত বিমান ভাড়া করছেন।
এতে একদিকে বিকল্প বিমানবন্দরের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সীমিতসংখ্যক ব্যক্তিগত বিমানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভাড়াও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ফ্লাইট চলাচলের অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে ব্যক্তিগত বিমানে যাত্রা করার সুযোগ সবার নেই। এর বিপরীতে, যাঁরা এই ব্যয় বহন করতে পারছেন না, তাঁদের কেউ কেউ বাহরাইন বা কাতারে গিয়ে সেখান থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
বাতিল সাড়ে ৫ হাজারের বেশি ফ্লাইট
বিমান চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, হামলা শুরুর পর থেকে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল—এমন ৫ হাজার ৫০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাও তাদের কার্যক্রম সীমিত করেছে। জার্মানির লুফথানসা ও ইতালির আইটিএ সৌদি আরবে ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও এয়ার ফ্রান্সের মতো সংস্থাগুলোও আগেই তাদের ফ্লাইট পিছিয়ে দিয়েছিল।
এত বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের বিকল্প পরিবহন খোঁজার চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিমান চলাচলের স্বাভাবিক সময়সূচি, যাত্রী পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিমান চলাচলসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণা, ফ্লাইট পুনরায় চালু হলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক নাও হতে পারে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিমান ও ক্রুদের প্রাপ্যতা এবং পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে সময় লাগতে পারে।
যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচেও চাপ
ব্যক্তিগত বিমানের ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকাররা।
সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বিমান পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাঝুঁকি মূল্যায়ন, বিমা এবং পরিচালনাগত ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঝুঁকি বেড়ে গেলে এসব খাতে অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ বিমান পরিচালনাকারীদের ওপর পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচ ঠিক কত শতাংশ বেড়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
বিমানবন্দর চালুর ঘোষণা, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিদের ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হামলার পর ১০ অক্টোবর থেকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে রোববার বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর কথা বলা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি আর কোনো হালনাগাদ তথ্য দেয়নি।
ফলে বিমানবন্দর চালুর ঘোষণা এবং বাস্তবে স্বাভাবিক ফ্লাইট পরিচালনার মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিমান চলাচলসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও মনে করছে, কার্যক্রম শুরু হলেও তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।
সংকটের প্রভাব কার ওপর কতটা?
বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত বিমান ভাড়া করতে সক্ষম ধনী যাত্রী ও করপোরেট নির্বাহীরা বিকল্প পথে দেশ ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ যাত্রীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা তুলনামূলক জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ হতে পারে।
বাহরাইন ও কাতারে গিয়ে বাণিজ্যিক ফ্লাইট ধরার চেষ্টা সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ, বিমান চলাচলে বিঘ্ন শুধু যাত্রার সময়সূচি বদলে দিচ্ছে না; যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পথ এবং সেই যাত্রার আর্থিক সামর্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত বিমানের ভাড়া বৃদ্ধি, যুদ্ধঝুঁকি বিমার ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর ফ্লাইট স্থগিতের ঘটনা দেখাচ্ছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব বিমান চলাচলের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।
সামনে কী হতে পারে?
রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল কখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা স্পষ্ট নয়। বিমানবন্দর পুনরায় চালুর বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির ওপর নির্ভর করবে যাত্রী পরিবহন কত দ্রুত স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারে।
এর মধ্যে ব্যক্তিগত বিমানের সীমিত প্রাপ্যতা ও বাড়তি চাহিদা ভাড়ার ওপর চাপ ধরে রাখতে পারে। যুদ্ধঝুঁকি বিমার ব্যয়ও বিমান পরিচালনাকারীদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, রিয়াদে বিমান চলাচলের এই সংকটের তাৎক্ষণিক চিত্র হলো—বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল, বিকল্প বিমানবন্দরের ওপর নির্ভরতা এবং ব্যক্তিগত বিমান ভাড়ায় বড় ধরনের বৃদ্ধি। তবে পরিস্থিতি কত দিন স্থায়ী হবে এবং এর ফলে বিমান চলাচলের ব্যয় কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ফ্লাইট কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের গতির ওপর।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন