রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকে সমগ্র মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ ও অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, সিরাত শুধু রাসুলের জীবনী নয়, বরং আল্লাহর পছন্দকৃত এমন একটি জীবনব্যবস্থা- যা অনুসরণ করলে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করতে পারে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডি ক্রিকেট মাঠে ‘রুহামা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’র উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ পুরস্কার বিতরণী ও সীরাত কনফারেন্স অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ রবিউল আলম আরও বলেন, সিরাতের আভিধানিক অর্থ জীবনী। সিরাতুন্নবী অর্থ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী। তবে সিরাতকে শুধু জীবনী হিসেবে দেখলে এর ব্যাপকতা বোঝা যাবে না। সিরাত হচ্ছে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পছন্দকৃত এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় জীবন।
তিনি বলেন, যে জীবন আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করা, তাঁর নৈকট্য ও আনুগত্য লাভ এবং তাঁর দাসত্বের জন্য নিবেদিত থাকে, সেই জীবনই সিরাত। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাপিত জীবনে তার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা রয়েছে।
রাসুলের বহুমুখী ভূমিকার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন- তিনি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা ছিলেন, রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, রাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন, বিচারক ছিলেন, সেনানায়ক ছিলেন এবং ইমাম ছিলেন। যুদ্ধের সময় তিনি শুধু নেতৃত্বই দেননি, যুদ্ধের কৌশলও নির্ধারণ করেছেন। আবার সন্ধির সময় কূটনীতিক হিসেবেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রসঙ্গ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ওই সন্ধির শর্ত অনেক সাহাবির কাছে মুসলমানদের বিপক্ষে যাচ্ছে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মধ্যেই বিজয় দেখতে পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে রক্তপাত ছাড়াই বিজয় অর্জিত হয়। এর মাধ্যমে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়।
সিরাত কনফারেন্সে শিশুদের অংশগ্রহণের প্রশংসা করে শেখ রবিউল আলম জানান, তিনি কয়েকজন শিশুর উপস্থাপনা শুনেছেন। কেউ বাংলায়, কেউ আরবিতে এবং কেউ ইংরেজিতে বক্তব্য দিয়েছে। ছোট শিশুদের বাচনভঙ্গি, চাহনি ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
তবে শিশুদের উপস্থাপনার ধরন নিয়ে নিজের একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইসলামী স্কলারদের প্রচলিত উপস্থাপনার ধরন শিশুরা অনুসরণ করছে। এর পরিবর্তে দেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও পারিবারিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের উপস্থাপনা আরও সহজ ও জনবান্ধব হওয়া প্রয়োজন।
মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আরও বলেন, শিশুদের উপস্থাপনায় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ততা থাকলে তা মানুষের কাছে বেশি হৃদয়গ্রাহী হবে এবং মানুষের মননে প্রভাব ফেলবে। এতে সিরাতের শিক্ষা অনুসরণে মানুষ আরও উৎসাহিত হবে।
মন্ত্রী বলেন, ইসলামী বক্তব্য ও ওয়াজের ক্ষেত্রে একটি গতানুগতিক উপস্থাপনার ধারা রয়েছে। কোমলমতি শিশুরা যেন আধুনিক ও বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সহজ ও স্বাভাবিকভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, উপস্থাপনা সহজ, সমাজবান্ধব ও পরিবারবান্ধব না হলে অনেক ভালো জানা ও ভালো বক্তব্যও মূলধারার মানুষের কাছে আকর্ষণ তৈরি করতে পারে না। এতে একটি প্রজন্ম নির্দিষ্ট একটি কমিউনিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ইসলামী স্কলারদের উদ্দেশে শেখ রবিউল আলম বলেন, শিশুদের জন্য তারা যদি আরও উদার ও নমনীয়ভাবে বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন, তাহলে তা শিশুদের জন্য আরও শিক্ষাবান্ধব ও ক্যারিয়ারবান্ধব হবে।
বক্তব্যে আফগানিস্তানের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। আফগানিস্তান ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দেশটির দীর্ঘ ইতিহাসে উপনিবেশিক আধিপত্য, সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী শাসনের পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক শাসনের প্রভাবও ছিল। এসব পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে তারা নিজেদের মতো করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, আফগানিস্তানে এখনো ৫০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বসবাস করছে এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। দেশটির মাথাপিছু আয় এখনো ৭০০ ডলারের বেশি এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে দেশটি এখনো নিম্ন আয়ের দেশের মধ্যে রয়েছে। তবে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে তারা।
কোরআন ও সিরাতের শিক্ষা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভ করতে হলে কোরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে একজন সাচ্চা মুসলিম হিসেবে জীবনযাপন করতে হবে।
তিনি বলেন, আপনি আল্লাহর বিধান বিশ্বাস করেন, অনুসরণ করেন- আপনি সাচ্চা মুসলিম। আবার আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা করার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকলে আপনি মুমিন।
নতুন প্রজন্মকে শুধু সিরাত পড়া ও জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তা জীবনে অনুশীলনের আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, কোরআন পড়তে হবে, সিরাত জানতে হবে। একই সঙ্গে সেই শিক্ষা আত্মস্থ ও অনুশীলন করতে হবে।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সত্যবাদিতা ও নৈতিক চরিত্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শৈশব থেকেই যদি জীবন সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই জীবন সত্যের পথেই থাকবে। কিন্তু মিথ্যার ওপর নির্ভরশীল জীবন থেকে বের হয়ে আসা কঠিন।
নতুন প্রজন্ম যেন শুধু মর্যাদা, অর্থ ও বস্তুগত সাফল্যের পেছনে না ছুটে আল্লাহর পছন্দের বান্দা হওয়ার জন্য জীবন গড়ে তোলে, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে শেখ রবিউল আলম বলেন, আগের প্রজন্ম জীবনে অনেক ভুল করে থাকতে পারে, আমলে ঘাটতিও থাকতে পারে। তবে প্রত্যাশা হলো, নতুন প্রজন্ম যেন সাচ্চা মুসলিমের যাপিত জীবন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন অনুসরণ করে।
সবশেষে শিশুদের উদ্দেশে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সমাজের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ততা রেখে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকে জানতে ও উপস্থাপন করতে হবে। তা হলে সিরাতের শিক্ষা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন