বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলেই এখন একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি উঠে আসে—ডলার সংকট। কেউ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে উদ্বিগ্ন, কেউ রেমিট্যান্স বাড়ানোর কথা বলছেন, আবার কেউ আরও বেশি গার্মেন্টস রপ্তানির ওপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলো কি সমস্যার মূল কারণ, নাকি কেবল উপসর্গ?আমার মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকট ডলারের নয়; বরং উৎপাদনশীলতার (Productivity) সংকট। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে সে কত দক্ষতার সঙ্গে মূল্য সংযোজন করতে পারে, কত উদ্ভাবন সৃষ্টি করতে পারে এবং বিশ্ববাজারে কত উচ্চমূল্যের সেবা ও পণ্য রপ্তানি করতে পারে।
গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুটি প্রধান স্তম্ভ ছিল—রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক শিল্প। এই দুটি খাত দেশের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন, রোবোটিক্স এবং ডিজিটাল অর্থনীতি উৎপাদন ও শ্রমবাজারের কাঠামো পাল্টে দিচ্ছে। ফলে কম দক্ষ শ্রমনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল দীর্ঘমেয়াদে আর টেকসই নাও থাকতে পারে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এখন দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অথচ আমরা এখনো প্রধানত অদক্ষ শ্রম রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে এই নির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এখনই আমাদের শ্রমশক্তিকে নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা জরুরি। AI, ডেটা, ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স, সাপ্লাই চেইন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলাই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
একইভাবে, গার্মেন্টস শিল্প আমাদের অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি হলেও, একটি মাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। তাই আমাদের নতুন প্রবৃদ্ধির খাত তৈরি করতে হবে। কেয়ার ইকোনমি, ক্রিয়েটর ইকোনমি, সফটওয়্যার ও আইটি সেবা, ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন এবং এসএমইভিত্তিক ব্যবসাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। এই তরুণদের কেবল চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একটি উদ্যোক্তা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করেন না; তিনি আরও অনেক মানুষের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করেন। ফলে উদ্যোক্তা উন্নয়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
এই বাস্তবতায় সরকারের জন্য কয়েকটি নীতিগত উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, প্রতিটি উপজেলায় দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা উন্নয়নকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে তরুণরা আধুনিক ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা শিখতে পারবে। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক আয় অর্জনকারী ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল সেবা রপ্তানিকারকদের জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধি করা। তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজে ব্যবসা শুরু করার জন্য নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া আরও সহজ ও প্রযুক্তিবান্ধব করা।
আজকের বিশ্বে প্রতিযোগিতা শুধু পণ্য উৎপাদনের নয়; প্রতিযোগিতা দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং জ্ঞানের। বাংলাদেশ যদি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারে এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারে, তাহলে আগামী দশকে দেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ গরিব নয়; আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পুরোনো অর্থনৈতিক মডেল থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে পারলেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।